পুরাতন দলিল খুঁজে বের করার সহজ ৪টি উপায়
পুরাতন দলিল হারিয়ে গেছে? জানুন বের করার সহজ উপায় ও খরচ
![]() |
| পুরাতন দলিল খুঁজে বের করার সহজ ৪টি উপায় |
অনেক সময় দেখা যায়, আপনার নামে জমির রেকর্ড বা পর্চা ঠিকই রয়েছে, কিন্তু সেই রেকর্ড কোন দলিলের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, সেই মূল দলিলটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরাতন দলিলের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়।
অনেকে জেলা রেকর্ড রুমে দলিলের তল্লাশি দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি বলা হয়, সূচিপত্রের পাতা ছেঁড়া, ভলিউমের পাতা নষ্ট অথবা প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তখন অনেকেই ধরে নেন যে দলিলটি আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
আসলে বিষয়টি সবসময় এমন নয়।
একটি দলিল সংরক্ষণ করার সময় বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক সূচিপত্র তৈরি করা হয়ে থাকে। ফলে একটি সূচিপত্রে সমস্যা থাকলেও অন্য তথ্য ব্যবহার করে দলিল খুঁজে বের করার সুযোগ থাকতে পারে।
এই প্রতিবেদনে পুরাতন দলিল খুঁজে বের করার কয়েকটি সহজ পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।
গুরুত্বপূর্ণ: নিচের তথ্যগুলো আপনার দেওয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। বাস্তবে দলিল অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া অফিস ও রেকর্ডের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
একটি পুরাতন দলিল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় কেন?
পুরাতন দলিল খুঁজতে গিয়ে অনেকেই জেলা রেকর্ড রুমে সমস্যার মুখোমুখি হন। বিশেষ করে পুরাতন ভলিউম বা সূচিপত্রের পাতা নষ্ট বা ছেঁড়া থাকলে নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে দলিল শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
আপনার কাছে হয়তো জমির রেকর্ড বা পর্চা রয়েছে, কিন্তু দলিল নম্বর বা দলিলের তারিখ জানা নেই। আবার কারও কাছে দলিলদাতা বা গ্রহীতার নামও নেই।
এমন পরিস্থিতিতে একটিমাত্র তথ্যের ওপর নির্ভর না করে অন্য তথ্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
১. দাতা ও গ্রহীতার নাম দিয়ে পুরাতন দলিল খুঁজুন
জেলা রেকর্ড রুমে দলিল সংরক্ষণের সময় বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সূচিপত্র তৈরি করা হয়। এর মধ্যে দলিলের দাতা ও গ্রহীতার নাম অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
অর্থাৎ, জমিটি যিনি দিয়েছেন এবং যিনি গ্রহণ করেছেন, তাদের নামের ভিত্তিতেও দলিলের তথ্য অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
তবে সমস্যা হতে পারে যদি দাতা-গ্রহীতার নামের সূচিপত্রের পাতা নষ্ট বা ছেঁড়া থাকে।
সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র এই একটি সূচিপত্রের ওপর নির্ভর না করে অন্য তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করতে হবে।
২. দলিলের তারিখ বা দলিল নম্বর দিয়ে তল্লাশি করুন
একটি দলিলের আরও গুরুত্বপূর্ণ দুটি তথ্য হলো:
- দলিল সম্পাদনের তারিখ
- দলিল নম্বর
দলিল সংরক্ষণের সময় এসব তথ্যের ভিত্তিতেও সূচিপত্র তৈরি হয়ে থাকে।
তাই দাতা-গ্রহীতার নাম দিয়ে দলিল পাওয়া না গেলে দলিলের সম্পাদনের তারিখ দিয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
তারিখ জানা না থাকলেও যদি দলিল নম্বর জানা থাকে, তাহলে দলিল নম্বরের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা যায়।
অর্থাৎ, কোনো একটি সূচিপত্রে সমস্যা থাকলে অন্য সূচিপত্র ব্যবহার করার সুযোগ থাকতে পারে।
আপনাকে যদি বলা হয়, “সূচিপত্রের পাতা ছেঁড়া, তাই দলিল পাওয়া যাচ্ছে না”, তাহলে জানতে পারেন:
দাতা-গ্রহীতার নামের সূচিতে সমস্যা হলে দলিলের তারিখ দিয়ে খুঁজে দেখা যায় কি না।
তারিখেও সমস্যা থাকলে দলিল নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান করা যায় কি না সেটিও জানতে পারেন।
৩. দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বর ব্যবহার করে দলিলের তথ্য খুঁজুন
অনেকের কাছে পুরাতন দলিলের নম্বর বা তারিখ থাকে না। কিন্তু জমির দাগ নম্বর অথবা খতিয়ান নম্বর জানা থাকতে পারে।
এই তথ্যও দলিল অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দলিলের তফসিলে সাধারণত জমির দাগ ও খতিয়ান সংক্রান্ত তথ্য থাকে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেও সূচি তৈরি করা হয়ে থাকে।
তাই আপনার কাছে যদি দাগ নম্বর থাকে, তাহলে সেই দাগ নম্বর ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান বা অন্যান্য তথ্য বের করার চেষ্টা করতে পারেন।
এরপর সেই দাগ ও খতিয়ানের তথ্য ব্যবহার করে জেলা রেকর্ড রুমে দলিলের তল্লাশি দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
দাগ নম্বর না থাকলে কী করবেন?
এখানেই অনেকের সমস্যা হয়।
আপনার কাছে যদি দলিল নম্বর না থাকে, তারিখ না থাকে এবং দাতা-গ্রহীতার নাম দিয়েও অনুসন্ধান করা সম্ভব না হয়, এমনকি দাগ নম্বরও জানা না থাকে, তাহলে প্রথমে জমির দাগ নম্বর বের করার চেষ্টা করতে হবে।
এর একটি উপায় হলো মৌজা নকশা ব্যবহার করা।
৪. মৌজা নকশা ও Working Volume-এর সাহায্যে দলিল খুঁজুন
রেজিস্ট্রি অফিসের আশপাশে সাধারণত বিভিন্ন এলাকার নকশা পাওয়া যেতে পারে। আপনার প্রয়োজনীয় মৌজার নকশা সংগ্রহ করে জমির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করতে পারেন।
মৌজা নকশা হাতে নিয়ে আপনার এলাকার জমি সম্পর্কে অভিজ্ঞ কোনো প্রবীণ ব্যক্তি বা জমি সম্পর্কে ভালো জানেন এমন ব্যক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
নকশায় আপনার জমির অবস্থান শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট দাগ নম্বর বের করার চেষ্টা করুন।
এরপর সেই দাগ নম্বর ব্যবহার করে তহসিল কাচারি বা ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য দেখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
খতিয়ান থেকে পাওয়া দাগ, খতিয়ান এবং সাবেক দাগের তথ্য ব্যবহার করেও পরবর্তী অনুসন্ধান করা সম্ভব হতে পারে।
Working Volume কীভাবে কাজে আসতে পারে?
আপনি যদি সংশ্লিষ্ট খতিয়ান বের করতে পারেন, তাহলে সেই খতিয়ানের Working Volume সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে পারেন।
Working Volume-এর নমুনা কপি বা Draft-এ অনেক সময় রেকর্ডটি কীসের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, সেই সম্পর্কিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
সেখানে দলিলের:
- দলিল নম্বর
- দলিলের তারিখ
- রেকর্ড তৈরির ভিত্তি
সম্পর্কিত তথ্য থাকার সম্ভাবনা থাকে।
এই তথ্য পাওয়া গেলে দলিলের নম্বর ও তারিখ ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট দলিলের নকল উত্তোলনের জন্য অনুসন্ধান করা সহজ হতে পারে।
একটি দলিলের একাধিক সূচিপত্র থাকতে পারে
পুরাতন দলিল খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখা দরকার হলো, একটি দলিলের তথ্য শুধু একটি জায়গাতেই নির্ভর করে না।
বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক সূচিপত্র তৈরি হয়ে থাকে। যেমন:
দাতা-গ্রহীতার ভিত্তিতে
দলিলের দাতা ও গ্রহীতার নাম অনুসারে সূচি থাকতে পারে।
দলিলের তারিখের ভিত্তিতে
দলিল সম্পাদনের তারিখ অনুসারে তথ্য সাজানো থাকতে পারে।
দলিল নম্বরের ভিত্তিতে
দলিল নম্বর ব্যবহার করেও অনুসন্ধানের সুযোগ থাকতে পারে।
দাগ ও খতিয়ানের ভিত্তিতে
তফসিলে থাকা দাগ নম্বর ও খতিয়ান নম্বরের ভিত্তিতেও তথ্য সাজানো থাকতে পারে।
এছাড়া টিপসহি বা বালাম বহির মাধ্যমেও তথ্যের সূত্র পাওয়া যেতে পারে বলে বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই একটি সূচিপত্রে সমস্যা হয়েছে বলেই যে দলিলটি সম্পূর্ণভাবে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জেলা রেকর্ড রুমে কীভাবে প্রশ্ন করবেন?
আপনাকে যদি বলা হয়:
“সূচিপত্রের পাতা ছেঁড়া, তাই দলিল পাওয়া যাচ্ছে না।”
তাহলে আপনি বিকল্প তথ্য দিয়ে অনুসন্ধানের অনুরোধ করতে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে বলতে পারেন:
“দাতা-গ্রহীতার সূচির পাতা যদি ছেঁড়া থাকে, তাহলে দাগ নম্বর দিয়ে খুঁজে দেখুন।”
অথবা:
“দাগ নম্বরের সূচিতে সমস্যা থাকলে দলিল সম্পাদনের তারিখ দিয়ে খুঁজে দেখুন।”
আবার তারিখের তথ্য পাওয়া না গেলে:
“দলিল নম্বরের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা যায় কি না দেখুন।”
অর্থাৎ আপনার কাছে যে তথ্যটি আছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প সূচির মাধ্যমে দলিল শনাক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।
পুরাতন দলিল খোঁজার পুরো প্রক্রিয়াটি সহজভাবে
পুরো বিষয়টি সংক্ষেপে এভাবে বোঝা যায়:
ধাপ ১: আপনার কাছে থাকা দলিলের যেকোনো তথ্য সংগ্রহ করুন।
ধাপ ২: দাতা-গ্রহীতার নাম থাকলে সেই তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করুন।
ধাপ ৩: দলিলের তারিখ বা দলিল নম্বর জানা থাকলে সেটি ব্যবহার করুন।
ধাপ ৪: দাগ বা খতিয়ান নম্বর থাকলে সেটি দিয়ে অনুসন্ধান করুন।
ধাপ ৫: দাগ নম্বর জানা না থাকলে মৌজা নকশার মাধ্যমে জমির অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করুন।
ধাপ ৬: দাগ নম্বর পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য বের করুন।
ধাপ ৭: প্রয়োজন হলে Working Volume-এর নমুনা কপি বা Draft সংগ্রহ করে রেকর্ডটি কোন দলিলের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে তা খুঁজুন।
ধাপ ৮: দলিল নম্বর ও তারিখ পাওয়া গেলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে দলিলের নকল উত্তোলনের জন্য অনুসন্ধান করুন।
শেষ কথা
পুরাতন দলিল খুঁজে পাওয়া না গেলে প্রথমেই হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে জেলা রেকর্ড রুমের কোনো একটি সূচিপত্রের পাতা ছেঁড়া বা নষ্ট থাকলে অন্য তথ্যের মাধ্যমে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
আপনার কাছে যদি দাতা-গ্রহীতার নাম না থাকে, তাহলে দলিলের তারিখ বা নম্বর খুঁজুন। সেগুলোও না থাকলে দাগ বা খতিয়ান নম্বরের মাধ্যমে তথ্য বের করার চেষ্টা করুন।
আর দাগ নম্বরও জানা না থাকলে মৌজা নকশার সাহায্যে জমির অবস্থান শনাক্ত করে দাগ নম্বর বের করার চেষ্টা করা যেতে পারে। এরপর খতিয়ান এবং Working Volume-এর তথ্য ব্যবহার করে মূল দলিলের সূত্র পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি তথ্য না পাওয়া গেলে অন্য তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে।
তবে জমি ও দলিল সংক্রান্ত বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো তথ্যের ভিত্তিতে আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস বা অভিজ্ঞ দলিল/ভূমি বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে বিষয়টি যাচাই করে নেওয়া উচিত।
