জানুন আপনার নিকট কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে ২০২৫

জানুন আপনার নিকট কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে ২০২৫



কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে
কত ভরি স্বর্ণ থাকলে যাকাত দিতে হবে


যাকাত ফরজ ইবাদত এবং ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পবিত্র কোরআনে জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন- وَ اَقِیْمُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوةَ ‘তোমরা নামাজ আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো।’ (সুরা বাকারা: ১১০)

সুস্থমস্তিষ্ক, আজাদ, বালেগ মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জাকাত আদায় করা তার ওপর ফরজ হয়ে যায়। (আদ্দুররুল মুখতার: ২/২৫৯ বাদায়েউস সানায়ে: ২/৭৯,৮২) 


স্বর্ণের নিসাব হলো ৭.৫ তোলা বা ৯৫.৭৪৮ গ্রাম (প্রায়) আর রুপার নিসাব ৫২.৫ তোলা বা ৬৭০.২৪ গ্রাম (প্রায়)। 


স্বর্ণ ও রুপা হলো নিসাবের পরিমাপক।  যাকাতযোগ্য সম্পদের হিসাব এই দুই পরিমাপক দিয়েই হয়। ‘দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও ব্যবসায়িক পণ্যের নিসাব নির্ধারণে ফকির-মিসকিনদের জন্য যেটি বেশি লাভজনক হবে, সেটিকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করাই (অর্থাৎ বর্তমানে রুপাকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করাই) শরিয়তের নির্দেশ।’ (আহসানুল ফতোয়া: ৪/৩৯৪, আল ফিকহুল ইসলামি: ২/৬৬৯)


কারো কাছে যদি শুধু রুপা থাকে এবং যদি রুপার নেসাব পূর্ণ না হয়, তাহলে তার ওপর  যাকাত  আবশ্যক হবে না। একইভাবে কারো কাছে শুধু স্বর্ণ থাকলে স্বর্ণের নিসাব পূর্ণ হলেই জাকাত ফরজ হবে। (হেদায়া: ১/১৭৯; তাতারখানিয়া: ২/২৩৭; মাসবুত: ২/১৯১; বাদায়েয়ুস সানায়ে: ২/১৮)


আরও পড়ুন: 

কিন্তু কারো কাছে যদি ন্যূনতম সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ না থাকে, কিন্তু কিছু রুপা থাকে, তাহলে তাকে হিসাব করতে হবে রুপাকে পরিমাপক ধরে। অর্থাৎ সোনা, রুপা এবং জাকাতযোগ্য সব সম্পদ মিলে যদি কমপক্ষে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ হয় বা আরও বেশি হয়, তাহলে তাকে সমুদয় সম্পদের মূল্যের ৪০ ভাগের একভাগ বা আড়াই শতাংশ জাকাত দিতে হবে।


এই পরিমাপক ও নিসাব প্রতি বছরই একই থাকে। কোনো সময় তা কমবেশি হয় না। অর্থাৎ ২০২৫ সালে এসে স্বর্ণের নিসাব কমবেশি হবে না; বরং সাড়ে ৭ ভরিই থাকবে। আর রূপার নিসাবও থাকে সাড়ে ৫২ তোলা। চাই তা যে সালেই হোক।


সোনা-রুপার বর্তমান বাজার দর

২০২৫ সালে আজকের বাজারে বাজুসের ঘোষণা অনুযায়ী স্বর্ণের দাম (২২ ক্যারেট) ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫২৫ টাকা। জাকাতের হিসাবে এই মানের স্বর্ণ সাড়ে ৭ ভরির দাম ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩৮ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২৮ হাজার ৯৭৪ টাকা। ২১ ক্যারেটের স্বর্ণ প্রতিভরির দাম ১,৪৪,৪০০ টাকা। জাকাতের হিসাবে এই মানের স্বর্ণ সাড়ে ৭ ভরির দাম ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২৭ হাজার ৭৫ টাকা। ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ প্রতিভরির দাম ১,২৩,৭৬৭ টাকা। জাকাতের হিসাবে এই মানের স্বর্ণ সাড়ে ৭ ভরির দাম ৯ লাখ ২৮ হাজার ২৫৩ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২৩ হাজার ২০৭ টাকা। সনাতন স্বর্ণ প্রতিভরির দাম ১,০১,৯৩২ টাকা। জাকাতের হিসাবে এই মানের স্বর্ণ সাড়ে ৭ ভরির দাম ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৪৯০ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ১৯ হাজার ১১৩ টাকা।


২২ ক্যারেটের ১ ভরি রুপার দাম ২১০০ টাকা। এই মানের রুপা সাড়ে ৫২ ভরি বা তোলার দাম হয় ১ লাখ ১০ হাজার ২৫০ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২৭৫৭ টাকা। ২১ ক্যারেটের ১ ভরি রুপার দাম    ২০০৬ টাকা। এই মানের রুপা সাড়ে ৫২ ভরির দাম হয় ১ লাখ ৫ হাজার ৩১৫ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২৬৩৩ টাকা। ১৮ ক্যারেটের ১ ভরি রুপার দাম ১৭১৫ টাকা। এই মানের রুপা সাড়ে ৫২ তোলার দাম হয় ৯০ হাজার ৩৮ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ২২৫১ টাকা। সনাতন ১ ভরি রুপার দাম ১২৮৩ টাকা। এই মানের রুপা সাড়ে ৫২ ভরির দাম হয় ৬৭ হাজার ৩৫৮ টাকা। এই টাকার জাকাত আসে ১৬৮৪ টাকা। 


উল্লেখিত হিসাব বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী করা হয়েছে। স্বর্ণ বা রুপার দাম অনুযায়ী পরবর্তীতে এটি কমবেশি হতে পারে। ‘নগদ অর্থ কিংবা সমমূল্যের অন্য যেকোনও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে দিলেও জাকাত আদায় হবে।’ (আবু দাউদ: ১৫৭২; সুনানে তিরমিজি: ৬২৩)


আরও পড়ুন: 

টাকাপয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাত রুপার নিসাবে হবে

দেশি-বিদেশি মুদ্রা ও ব্যবসায়িক পণ্যের নিসাব নির্ধারণে ফকির-মিসকিনদের জন্য যেটি বেশি লাভজনক হবে, সেটিকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করাই (অর্থাৎ বর্তমানে রুপাকে পরিমাপক হিসেবে গ্রহণ করাই) শরিয়তের নির্দেশ। (আহসানুল ফতোয়া: ৪/৩৯৪, আল ফিকহুল ইসলামি: ২/৬৬৯)


কারো কাছে সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা কিংবা বাণিজ্যদ্রব্য পৃথকভাবে বা সম্মিলিতভাবে নিসাব পরিমাণ ছিল, বছরের মাঝে এ জাতীয় আরো কিছু সম্পদ কোনো সূত্রে পাওয়া গেল এক্ষেত্রে নতুন প্রাপ্ত সম্পদ পুরাতন সম্পদের সঙ্গে যোগ হবে এবং পুরাতন সম্পদের বছর পূর্ণ হওয়ার পর সমুদয় সম্পদের জাকাত দিতে হবে। (মুসান্নাফে আবদুর রাজজাক: ৬৭৯৭,৬৮৫১; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৯৯৩৭)

 

রমজানে যারা জাকাত দেওয়ার নিয়ত করেছেন, তারা রমজানে রুপার বাজার দর অনুযায়ী সোনা-রুপা ও জাকাতযোগ্য সব সম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ রুপার নিসাবে জাকাত আদায় করবেন। সর্বনিন্ম কত টাকা থাকলে জাকাত ফরজ, তা-ও জানিয়ে দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।


যাকাত সৌরবর্ষ হিসেবে দেওয়া যাবে?

জাকাত প্রতিবছর একবারই প্রদান করতে হয়। রমজান মাসে আদায় করা উত্তম। চান্দ্রবর্ষ ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনে হয়, আর সৌরবর্ষ ৩৬৫ দিনে বা ৩৬৬ দিনে হয়, তাই সৌরবর্ষ অপেক্ষা চান্দ্রবর্ষ ১১ বা ১২ দিন কম। সৌরবর্ষ হিসাবে জাকাত আদায় করতে চাইলে শতকরা ২.৫%-এর (আড়াই ভাগ) পরিবর্তে (২.৫% ভাগ ৩৫৪ x ৩৬৫) ২.৫৭৮% (বা ২.৫৮% প্রায়) দিতে হবে। অথবা মূল জাকাতের সঙ্গে অতিরিক্ত ১১ দিনের হিসাব যোগ করতে হবে, যথা ২.৫% ভাগ ৩৫৪ x ১১)। (জাকাত নির্দেশিকা, পৃষ্ঠা-১৬)


আরও পড়ুন: 

জাকাত না দেওয়ার শাস্তি

কোরআন ও হাদিসে জাকাত আদায় না করার কঠিন শাস্তির কথা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং যারা সোনা ও রুপা জমা করে রাখে, তা আল্লাহর পথে খরচ করে না, আপনি তাদের বেদনাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দিন। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে, অতঃপর তা দিয়ে তাদের কপালে, পার্শ্বদেশে ও পিঠে সেঁক দেওয়া হবে, (বলা হবে) এটা তা-ই যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা রাখতে, অতএব তোমরা যা জমা করেছিলে তার স্বাদ উপভোগ করো। ’ (সুরা তাওবা: ৩৪-৩৫)


অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুগ্রহে প্রদত্ত সম্পদ নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন এটাকে কিছুতেই কল্যাণকর মনে না করে, তারা যা নিয়ে কৃপণতা করে কেয়ামতের দিন তাই তাদের গলায় বেড়ি হবে, আসমান ও জমিনের স্বত্বাধিকার একমাত্র আল্লাহর, তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ তা বিশেষভাবে অবহিত।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৮০)


রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে টাক (বিষের তীব্রতার কারণে) মাথাবিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দিয়ে তার গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। সাপটি তার মুখের দুই পাশ কামড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত সম্পদ।’ অতঃপর রাসুল (স.) ওপরে উল্লিখিত সুরা আলে ইমরানের আয়াতটি পাঠ করেন। (বুখারি: ১৪০৩)


যাকাতের  ফজিলত

 যাকাত  আদায়কারীর জন্য মহাপুরস্কার ঘোষণা করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর যারা সালাত আদায় করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে আমি তাদেরকে মহাপুরস্কার দিব।’ (সুরা নিসা: ১৬২) অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমার দয়া তো প্রত্যেক বস্তুতে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমি এ রহমত (পরিপূর্ণভাবে) সেইসব লোকের জন্য লিখব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে,  যাকাত  দেয় এবং যারা আমার আয়াতসমূহে ঈমান রাখে।’ (সুরা আরাফ: ১৫৬)


 যাকাত  প্রদান ঈমানের পূর্ণতার প্রমাণ। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘তোমার ইসলামের (ঈমান) পরিপূর্ণতা হলো তুমি তোমার সম্পদের  যাকাত  দাও।’ (আত-তারগিব ওআত-তারহিব, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৩০১, হাদিস : ১২)


Next Post Previous Post